LOADING

Type to search

কালাপাহাড় চূড়ায় : A Trip to মৌলভীবাজার

Share
Spread the love
  • 166
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    166
    Shares

কালাপাহাড় সিলেট বিভাগের সবচেয়ে উচু পাহাড়। উচ্চতা ১০৯৮ ফুট। অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কার্মধা ইউনিয়নে ভারত সীমান্তে। এক দিনে এক্সট্রিম এডভেঞ্চার আর ট্র্যাকিং এর জন্য কালা পাহাড় একটি আদর্শ স্থান। আমাদের এবারের অভিযান কালা পাহাড় জয়।

ঢাকা থেকে সিলেট গামী রাত ৯.৩০ মিনিটের উপবন এক্সপ্রেস এ চেপে বসলাম উদ্দেশ্য কুলাউড়া। শ্রাবণ মাস। বাতাস আদ্র। বসে আছি ট্রেনের জানালার পাশে।

বাহিরের আঁধার ভেদকরে জানালা দিয়ে আসা শীতল বাতাস যেন স্বর্গীয় উপহার ।

রাতের নীরবতা ভেঙ্গে ট্রেন ছুটে চলছে । রাত ৪ টায় ট্রেন আমাদের কুলাউড়া নামীয়ে দিয়ে সিলেট চলে গেলো। ভোঁর হতে এখনো অনেক দেরি। ভাবলাম চায়ের কাপ হাতে বাকী সময় টুকু কাটিয়ে দেব কিন্তু বেরসিক সময় যেন কাটেনা তাই প্লাটফর্মের বেঞ্চে শুয়ে বৃথা ঘুমের চেষ্টা ।

রাতের আধার ভেদ করে পূর্ব আকাশে সূর্যি মামা উঁকি দেয়ার সাথে সাথে সিএনজি ঠিক করে ফেলি। গন্তব্য আজগরাবাদ চা বাগান । সিএনজি ছুটে চলছে। দুপাশে শান্ত প্রকৃ্তি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ধিরে ধিরে ব্যস্ত হয়ে উঠছে গ্রামীন জনপথ। আজগরাবাদ চা বাগান আসতেই আমাদের অব্যর্থনা জানালো ঘন সবুজ চা বাগান আর গুরি গুরি বৃষ্টি। এখান থেকেই মূলত ট্রেকিং শুরু।

DSC_0227

আজগরাবাদ চা বাগানের ভিতর দিয়ে মাটির রাস্তা

সকাল ৬.৩০। বর্ষা কাল। গুরি গুরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাটা শুরু করলাম আজগরাবাদ চা বাগানের ভেতর দিয়ে আকা বাঁকা উঁচুনিচু কাচা মাটির পথ ধরে। চা বাগানের গণ্ডি পেরুতেই ঝিরি পথের উপর নড়বরে বাঁশের সাঁকো। সাঁকো পার হতেই শুরু হলো উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ। দুপাশে ঘন অরণ্য। ঝিঁঝিঁ পোকার কড়া শব্দ। এমনি পাহাড়ি পথ ধরে ৫, ৬ টি বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম বেগুণছড়া পুঞ্জিতে। বেগুণছড়া পুঞ্জিতে প্রবেশের পূর্বেই চোখে পরলো পাহাড়ের উপর ফুটবল মাঠ আর দূরে সবটুকু সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘে ঢাকা কালাপাহাড়। হ্যাঁ আমাদের গন্তব্য ঐ কালাপাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ।

বেগুণছড়া পুঞ্জি, এটা মূলত খাসিয়াদের গ্রাম। খাসিয়ারা গ্রামকে বলে “পুঞ্জি” । পাহাড়ের উপর সাজনো গোছাল পরিচ্ছন্ন একটি গ্রাম। এ গ্রামে ৩০ থেকে ৩৫ টি পরিবারের বাস। এখানের প্রায় সবাই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। পেশায় সবাই পান চাষি। এদের প্রধান আয়ের উৎস পান চাষ। পাহাড়ী গাছে এরা পান চাষ করে। পুঞ্জির হেড লেম্বু দা। উনার কাছ থেকেই গাইড নিতে হবে। তাই সোজা চলে যাই উনার বাড়িতে। তখন ঘড়িতে সময় সকাল ৭.৩০ মিনিট। লেম্বু দা ঘুমিয়ে ছিল। লেম্বু দার ছেলে আমাদের গাইড ঠিক করে দিলো। অল্প বয়সী অথিতিপরায়ন একটা ছেলে,  অসাধারণ ব্যবহার। সে জানালো শীতের দিনে বেশকিছু গ্রুপ এখানে ঘুরতে আসলেও বর্ষায় খুব কম গ্রুপই আসে।

আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। ভাপসা গরম। আমাদের দলের সদস্য সংখ্যা ৪ জন। হাতে আছে মাত্র ১.৫০ লিটার পানি। আজগরাবাদ চা বাগানের সামনের দোকান থেকে পানি কিনার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু দোকান বন্ধ থাকায় সম্ভব হয়নি। আপনারা যারা আসবেন কুলাউড়া থেকে পানি নিয়ে আসবেন এতো সকালে এখানকার দোকান খোলা নাওপেতে পারেন। গাইডকে সাথে নিয়ে পুঞ্জি স্কুলের পাশদিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ ধরে হাঁটা শুরু করি চূড়ান্ত গন্তব্য সিলেট অঞ্চলের সর্বউচ্চ বিন্দু কালাপাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ। পাহাড় বেয়ে আমরা হেঁটে চলছি। দুপাশে জঙ্গল।  জঙ্গলের গাছ গুলতে চোখে পড়লো খাসিয়াদের লাগানো লতানো পান গাছ।

DSC_0267-01

কালাপাহাড় চূড়ায় আরোহণের সময়

 

প্রায় দের ঘণ্টা হাঁটার পর জুম চাষের এলাকা শেষ। এবার ঘন জঙ্গল। শতভাগ বুন পরিবেশ।  কিছু কিছু যায়গায় পায়ে হাঁটার পথো নেই।  বড় বড় ঘাস পারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি । লেম্বু দার ছেলের দেয়া তথ্যের সত্যতাও মিললো।যদি বর্ষায় খুব বেশী গ্রুপ আসতো তবে অনন্ত পায়ে হাঁটার পথটুকু থাকতো।

প্রখর রোদ। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত । আমাদের সাথে থাকা পানি শেষ। । কিন্তু কোথও বসে বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই। কারন আমাদের চারপাশে ওৎ পেতে আছে রক্ত চোষা জোঁক। হাঁ ভয়াবহ রকমের জোঁক। দাঁড়ালেও জোঁক ধরে, হাঁটলেও জোঁক ধরে। দুপা থেকে জোঁক ছাড়াতে ছাড়াতে আমরা ক্লান্ত। কোথাও দাঁড়ালে চারপাশ থেকে পিপড়ার মতো আমাদের পায়ে উঠে যাচ্ছে জোঁক। ভয়াবহ রকমের জোঁক। বিশাল আকারের জোঁক। জোঁক আতংকো আমাদের মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেলো যখন আমাদের গ্রুপের দুইজন সদস্যের শরীরের স্পর্শকাতর স্থান থেকে কামড়রত অবস্থায় জোক উদ্ধার করা হলো। এবার বুঝেন এখানে জোঁকের ভয়াবহতা কতোটুকু।আপনারা যারা জোক দেখে ভয়পান তারা যদি বর্ষায় কালাপাহাড় আসতে চান তবে অবশ্যই সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আসবেন অথবা শীতে আসবেন জোঁকের কোন ভয় নেই।

আবশেষে জোঁকের ভয় জয় করে  আমরা পৌঁছে যাই কালা পাহাড়ের চূড়ায়।

বেগুণছড়া পুঞ্জি থেকে সময় লেগেছে প্রায় ২.৩০ মিনিট। চূড়াটা জঙ্গলে ভর্তি। চূড়া থেকে অল্প একটু নিচে নামলেই সমতল যায়গা। এটিই মূলত সামিট পয়েন্ট। চূড়া থেকে নিচে তাকালে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ। নিচের ছোট ছোট পাহাড় গুলো মনে হচ্ছিলো গালিচার মত।

যেহেতু অভিকর্ষ বল আমাদের পক্ষে সেহেতু আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম খুব দ্রুত নেমে যাব। পথ যতই ঢালু, পিচ্ছিল আর জঙ্গলময় হোকনা কেন। যাতে জোঁক আমাদের ধরতে না পারে। কিন্তু বেরসিক জোঁক তো আর পিছু ছাড়ার নয়। ধরেই যাচ্ছে আর আমরা ছাড়িয়েই যাচ্ছি। এ ভাবে দের ঘণ্টা নামার পর গাইড বললো আপনারা এইখানে বিশ্রাম নিতে পারেন এইদিকে জোঁক নেই। কারন জানতে চাইলে বললো আমরা তাদের জুম চাষের এলাকায় চলে এসেছি। জুম ক্ষেতে ঔষুধ দেয়ার ফলে জোঁক থাকে না।

রোদের তাপ যেন বেড়েই চলছে। পানির পিপাসায় আমাদের হাঁটার শক্তি ধিরে ধিয়ে কমে আসছিল। গাইডের দেয়া তথ্য মতে বেগুণছড়া পুঞ্জি ফেরের পথে ট্রেইলের শেষ ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে ঝিরি পথ ধরে। ঐ মুহূর্তে আমাদের একটাই চিন্তা  ছিলো কখন পাবো ঝিরি পথ, কখন পাবো পানির দেখা। আর নাকি হাঁটতে হবে ৩০ মিনিট।

অবশেষে পেয়ে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত ঝিরি। ঝিরিতে পানি বেশি নেই। কিন্তু গাঁ ভেজানর জন্য যতেষ্ঠ। সবাই শুয়ে পরলাম ঝিরির স্বচ্ছ শীতল জলে। মুহূর্তের মধ্যেই চলে গেলো সকল তৃষ্ণা আর সারাদিনের সকল ক্লান্তি। যেন জীবন ঝিরির স্বচ্ছ শীতল জলের মতই সুন্দর। জীবন সুন্দর।

দিনশেষে একটি এক্সট্রিম এডভেঞ্চার ও ট্র্যাকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ির পথে।

কিভাবে যাবেন ???

সবচেয়ে সহজ হয় যদি ঢাকা থেকে সিলেট গামী রাত ৯.৩০ মিনিটের উপবন এক্সপ্রেস এ যেতে পারেন। যা আপনাকে রাত ৪ টার দিকে কুলাউড়া ষ্টেশনে নামিয়ে দিবে।  কুলাউড়া ষ্টেশনের সামনে থেকে আজগরাবাদ চা বাগান পর্যন্ত  সিএনজি  রিজার্ভ করে নিন ভাড়া ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। গাইড খরচ ৫০০ টাকা। ফেরের সময় রাতের উপবন এক্সপ্রেস এ ফিরতে পারেন নয়তো বিকাল ৫.২০ মিনিটে এনা পরিবহনের একটা বাস ছড়ে  কুলাউড়া থেকে ভাড়া ৫০০ টাকা । এ ছাড়া বিভিন্ন পরিবহনের বেশ কিছু নাইট কোচ ছেড়ে আসে।


Spread the love
  • 166
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    166
    Shares
Tags:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *