LOADING

Type to search

নেত্রকোনা মোহনগঞ্জ হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর

নেত্রকোনা মোহনগঞ্জ হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর

Ariful 07/08/2018
Share
Spread the love
  • 74
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    74
    Shares

টাঙ্গুয়ার হাওর, অবস্থান  সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে । স্থানীয় ভাবে যাকে বলা হয় নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল । দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর।

টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়া যায় মুলত  দুইটি পথে ।প্রথম টি বাসে  সুনামগঞ্জ- তাহেরপুর হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর, দ্বিতীয় টি ট্রেনে  নেত্রকোনা- মোহনগঞ্জ-  ধর্মপাশা হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর। যদিও সবচে বেশি ব্যবহৃত ও পরিচিত পথ সুনামগঞ্জ- তাহেরপুর হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় কম খরচে টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়ার সবচে সহজ ও ভয়ংকর  সুন্দর পথটি হচ্ছে  নেত্রকোনা মোহনগঞ্জ-  ধর্মপাশা। এই পথে টাঙ্গুয়ার যেতে আপনাকে পারি দিতে হবে অনেক গুলো ছোট বড় বিল ও হাওড় । খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন  ভাটির দেশের মানুষের পানির জীবন , জীবন সংগ্রাম, প্রকৃত পক্ষে হাওরের আসল রূপ। তবে চলুন ঘুরে আসি নেত্রকোনা – মোহনগঞ্জ-  ধর্মপাশা হয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিশাল জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর ।

সালটা ২০১৭ সেপ্টেম্বর মাস ২৯ তারিখ, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ গামী রাত ১১.৫০ মিনিটের হাওর এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম উদ্দেশ্য মোহনগঞ্জ-  ধর্মপাশা হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর। সারা রাত ট্রেনের জানালা দিয়ে বৃষ্টিতে দৃষ্টি সীমানা ভিজিয়ে সকাল ৭ টায় নামলাম বৃষ্টি ভেজা মোহনগঞ্জ ষ্টেশনে। মোহনগঞ্জ এ সকালের নাস্তা সেরে  অটোতে করে আসলাম ৫ কিলো দূরে  ধর্মপাশা। এবার স্থল পথে চূড়ান্ত  গন্তব্য  ধর্মপাশা  থেকে ১৯ কিলো দূরে মধ্যনগর বজার ।

টাঙ্গুয়ার হাওর

ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে তোলা। ছবি- নাজমুল হুদা

ধর্মপাশা থেকে অটোতে উঠতেই  বৃষ্টি মাত্রা বেড়ে গেলো কয়েক গুন সেই সাথে দুপাশের সৌন্দর্যও।  ধর্মপাশা বাজার থেকে কয়েক কিলো আসতেই খেয়াল করলাম আমরা চলে এসেছি হাওরে। হওরের উপর দিয়ে পিচ ঢালা সড়ক। সড়কের দুপাশে শক্ত বাধ। দু দিকের দৃষ্টি সীমায় শুধু পানি আর পানি। ভারি বর্ষণ, প্রচণ্ড বাতাস, এ যেন ভয়ানক সৌন্দর্য । যদিও আমাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছিলো দূর সংবাদ।

হ্যাঁ আমরা হাওরে ঝড়ের কবলে। হাওরের ডেউ গুলো মনে হচ্ছিলো বিপদ সংকেতের সময়ের উত্তাল সাগরের ডেউ, আছড়ে পরছে সড়কের উপর । এ যেন  হাওরের ভয়ংকর  রুপ। আর আমাদের ট্রলারে উঠা হলো না। বিরূপ আবহাওয়ার কারনে সবাই দুঃখ ভরা মন নিয়ে ট্যুর বাতিল করে  ঢাকার পথে। কিন্তু আমি জানি হাওরের এই ভয়ংকর সৌন্দর্য্য আমাকে এই পথে আবার নিয়ে আসবে অবশ্যই আসবে…

সাল ২০১৮ জুন মাস, এবারের গল্পটা টা মধ্যনগর বাজার থেকে। ময়মনসিংহে বাসা হওয়াতে ব্যপারটা আমার জন্য অনেকটা সহজ হয়ে গেলো। সকাল ৬ টায় ময়মনসিংহ থেকে হাইছ রিজার্ভ করে সোজা মধ্যনগর বাজার। ঠীক মধ্যনগর বাজার নয় স্থল পথের শেষ সীমানা মাঝ খানে গোনাই নদী। নদীর ওপারে মধ্যনগর বাজার। যদিও হাওরে পানি টইটম্বুর থাকায় কোনটা নদী বোঝার উপাই নেই। মধ্যনগর বাজার টিকে দেখে মনে হচ্ছিলো  দ্বীপের মতো। সকাল ৯ টায়  বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উঠে পরলাম ট্রলারে, এবার কিন্তু হাওর শান্ত। আমি ট্রলারের ছাদে বসে বিশাল হাওরের বুকে বৃষ্টি দেখছি আর ট্রলার ছুটে চলছে টাঙ্গুয়ার পানে……

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থেমে আকাশে সূর্য উঁকি দিল।কড়া রোদ।বাতাস উষ্ণ ও  অার্দ্র। দিগন্ত জুড়ে শুধু পানি আর পানি। মাঝে মাঝে পানির উপর একাকী দাড়িয়ে থাকা মন খারাপের বৃক্ষ যেন আমদের জন্যই অপেক্ষমান। হাওরের মাঝে মাঝে কিছু গ্রাম ও বাজার। বাড়ি গুলো দেখে মনে হয় যেন ভাসমান।ইউনিয়ন পরিষদের বহুতল ভবনো যেন পানির উপর  দাঁড়িয়ে। ব্রাকের নৌকায় ভাসমান স্কুল যেখানে ছাত্র ছাত্রীও আসে নৌকায় করে। স্থল পথ বলে যেন কিছুই নেই হাটবাজার মসজিদে যাওয়া, এমন কি পাশের বাড়ি যেতে হলেও নির্ভর করতে হয় নৌকার উপর। এ যেন হাওরের সৌন্দর্যের উল্টো পিঠে  হাওরের মানুষের পানির জীবন, জীবন সংগ্রামের কাব্য।

প্রায় ৩ ঘণ্টা বসে আছি ট্রলারের ছাঁদে। হঠাৎ মাঝি বলে উঠলো মামা এটাই টাঙ্গুয়ার হাওর। হ্যাঁ তাইতো ঐ তো দেখা যাচ্ছে হিজল, করচ, বরুণ বৃক্ষরাজি।নিচে স্বচ্ছ নীল জল। টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির মাছ, প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি, ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির সাপ রয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে কিছু সময় ব্যয় করে সোজা গন্তব্য ট্যাকেরঘাট।

ট্যাকেরঘাট নেমে প্রথমে চোখে পড়লো চুনাপাথর (লাইমস্টোন) খনিজ প্রকল্পটি যা ১৯৬৬ সালে ট্যাকেরঘাট এ স্থাপিত হয়। এখান থেকে উত্তলিত চুনাপাথর ছাতক সিমেন্ট কারখানায় সরবরাহ করা হতো।  খনিজ প্রকল্পটির উত্তোলন কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকল্পটির ভিতরে একে বারে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে  অবস্থিত কোয়ারি লেক যাকে আধুনিক পর্যটকেরা নাম দিয়েছে নিলাদ্রী।  চুনাপাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই লেকের। যার গড় গভীরতা ১০০ ফুটের বেশি।  এক পাশে মেঘালয় পাহাড় অন্য পাশে সবুজ উঁচু টিলা মাঝ খানে  নীল স্বচ্ছ জলের এই লেক। এর নীল স্বচ্ছ জল দেখে ঝাপ দেয়ার আগে অবশ্যই লাইফ জ্যেকেট পরে নিবেন। কারন এই লেকে  মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে  একাধিক বার। এবার গন্তব্য লাকমাছড়া।

টাঙ্গুয়ার হাওর

মধ্যনগর বাজার থেকে টাঙ্গুয়ার যাওয়ার সময়

মটরসাইকেলে করে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে চলে আসি লাকমাছড়া।দেখে মনে হয়েছিলো ভুলে চলে এসেছি বিছনাকান্দি।  মেঘালয় পাহাড় থেকে ঝর্নার পানি ছড়া হয়ে নেমে এসে নাম হয়েছে লাকমাছড়া।স্বচ্ছ শীতল জল। এমন স্বচ্ছ শীতল জল দেখেতো আর বসে থাকা যায়না। সোজা নেমে পড়লাম  স্বচ্ছ শীতল জলে। স্থানীয়রা এই ছড়া থেকে কয়লা সংগ্রহে করে থাকে।

এবার ফেরার পালা। বিকাল ৬.৩০,  টাঙ্গুয়ার হয়ে আমাদের যাত্রা মধ্যনগর বাজার। অল্প সময়ের মধ্যেই সূর্য  ডুবে দূরের মেঘলয় পাহাড় গুলো অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগলো আর আমি ছাঁদে বসে অপেক্ষা করছিলাম ভয়ানক চাঁদের আলোর

ট্রলারের ছাঁদে এক কোনায় একা বসে দৃষ্টি হাওরের পানে। ভারত সীমান্তের সোডিয়াম লাইটের আলো গুলো যেন সৌন্দর্যের ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। হঠাৎ নিচে ভয়ানক ডেউ, উপরে ভয়ানক জ্যোৎস্না । এ যেনো হুমায়ূন আহমেদের সেই গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না। গৃহত্যাগী  জ্যোৎস্না বড়ই ভয়ানক জিনিস। যে কাউকে গৃহত্যাগ  করানের মত অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে।

কিভাবে যাবেন….

ঢাকা থেকে রাত ১১.৫০ মিনিটের ‘’হাওর এক্সপ্রেস’’ এ করে মোহনগঞ্জ। মোহনগঞ্জ থেকে অটো / লেগুনায় ধর্মপাশা বা সরাসরি মধ্যনগর। মধ্যনগর থেকে রিজার্ভ ট্রলারে টাংগুয়ার সময় লাগবে  প্রায় ৩ ঘণ্টা, পরে চলেযান  হয়ে ট্যাকেরঘাট। ট্যাকেরঘাট নেমে দুপুরের খাবার খেয়ে বাকী স্পট গুলো ঘুরে বিকাল ৬ টার মধ্যে মধ্যনগরের দিকে যাত্রা শুরু করুন।  মাঝি কে বলে রাখবেন মধ্যনগর থেকে  অটো/ লেগুনা ঠিক করে রাখতে নয়তো এতো রাতে  অটো/ লেগুনা পেতে সমস্যা হতে পারে। মোহনগঞ্জ থেকে রাত ১১.৩০ মিনিটের ‘’মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’’ এ করে সকালের মধ্যে ঢাকা ।


Spread the love
  • 74
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    74
    Shares
Tags:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *