LOADING

Type to search

ডাল লেকের সকাল-দুপুর-সন্ধা……

ডাল লেকের সকাল-দুপুর-সন্ধা……

Sajol Zahid 03/06/2018
Share
Spread the love
  • 609
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    609
    Shares

ঢাকা থেকে কলকাতা আর কলকাতা থেকে দিল্লী হয়ে শ্রীনগর যেতে, প্রায় দুই রাত নির্ঘুম থাকার কারনে গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না চাইতেও। অনেক চেষ্টা করেই চোখকে বস মানাতে না পারার কারনে ঘুমের কাছে সমর্পণ করেছিলাম। এসে গেছি, ওঠো বাবা, নামো তাড়াতাড়ি, ছেলের এমন অনবরত ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি আমাদের গাড়ি ডাল লেক ঘেসে দাড়িয়ে আছে। আর গাড়ি ঘিরে ধরে অনেক হোটেল আর হাউজ বোটের দালালরা। শ্রীনগর এই সময়ে(জুন) একদম ফাঁকা বা প্রায় টুরিস্ট শুন্যই বলা যায়। তাই সবাই নিজের সুবিধামত গন্ত্যব্যে নিয়ে যেতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

যাই হোক, সেসবে পাত্তা না দিয়ে আমাদের আগে থেকেই ঠিক করা হাউজ বোটের পাঠানো সিকারায় উঠে পরলাম দলবেঁধে। সিকারায় উঠে আর ওঠার আগে সবার কথা বার্তায়ও বুঝে ফেললাম আমরা প্রথমেই একটা ধরা খেয়েছি তবে হালকা ধরনের। যেটা হাউজ বোটে পৌঁছে আরও ভালো ভাবে বুঝলাম। যথেষ্ট ভালো আর আরাম দায়ক হাউজ বোট, কিন্তু কিছুতেই ১৬০০ টাকা দিয়ে থাকার মত নয়। এর চেয়ে অনেক ভালো মানের হাউজ বোটও পাওয়া যায় ১০০০ এর মধ্যে।

কিন্তু পরিবার নিয়ে, সকালে হোটেল বা হাউজ বোট খোঁজার ঝামেলা এড়াতেই আগে থেকে এই বুকিং করা হাউজ বোট। যদিও পরে মালিক ১২০০ টাকাতেই রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু আমরা মাত্র ১০০০ টাকায় বেশ ভালো মানের, লেক লাগোয়া হোটেল পেয়ে যাওয়াতে আর থাকিনি এক দিনের বেশী। তবে একটা আশা পুরুন হয়েছিল। মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম যে কাশ্মীরের হাউজ বোটে যেদিন থাকবো সেদিন এমন একটা সময় উঠবো যেন একই দিনে সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধা আর রাতের সব রকম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি। ঠিক তাই হয়েছিল, হাউজ বোটের সব রকম রূপই সেদিন পেয়েছিলাম, সকাল-দুপুর-সন্ধা আর আর রাত্রির।

ডাল লেক

ডাল লেকে দিয়ে যখন সিকারায় করে আমাদের জন্য নির্ধারিত হাউজ বোটে যাচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল ধুর আর কিসের ডাল লেক, কি এমন আছে এখানে? এর চেয়ে তো আমাদের স্বরূপকাঠি কোন ভাবেই কম নয়! এমনকি এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেছি কম-বেশী। এমনকি যখন হাউজ বোটে পৌছালাম তখনও এই মানসিকতার তেমন একটা পরিবর্তন হলনা কারো। মোট কথা প্রথম দর্শনেই মুগ্ধতায় ব্যাকুল হয়ে যাইনি আদৌ।

তবে এটা হতে পারে আগের টানা দুই রাত দুই দিন জার্নি আর নির্ঘুম রাত কাটানোর কারনে সাময়িক অবসন্নতার জন্য হয়তো। কারন ধীরে-ধীরে ফ্রেস হয়ে, নাওয়া-খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে যখন হাউজ বোটের সামনের খোলা কাঠের বারান্দা বা পাটাতনে চেয়ার পেতে বসলাম, তখন থেকে মুগ্ধতা ঘিরে ধরতে শুরু করলো, ডাল লেকের চারপাশ থেকে।

যখন হাউজ বোটে উঠি তখন হয় খেয়াল করিনি, নয়তো মেঘে ঢাকা ছিল। ফ্রেস হয়ে আর বিশ্রাম নিয়ে ফিরে আসতেই এতদিন ধরে সিনেমায় দেখে আশা ছবিগুলো চোখের সামনে বাস্তব হয়ে ধরা দিতে লাগলো, এঁকে, এঁকে…

নানান রঙের সিকারার শান্ত জলে বয়ে চলা, লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-বেগুনী আর গোলাপি, বর্ণিল ফুলে, ফুলে ভরা সিকারা গুলো ভেসে চলেছে এক হাউজ বোট থেকে আর এক হাউজ বোটের সিঁড়ির কাছে, দূরে পাহাড়ের সূর্যের সাথে লুকোচুরি খেলা সাথে নানা রঙের বদল ক্ষণে ক্ষণে, কখনো সবুজ, কখনো হলুদ আবার কখনো গোলাপির আভা, লেকের স্বচ্ছ পানিতে পাহাড়ের ছায়া, সিকারার রঙ-বেরঙের ছাঁদ গুলোর পানির নিচের নাচন, আর নানা রকমের ফলের বিকিকিনি।ডাল লেক

সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে সূর্য হেলে পরতেই চোখের ভেসে উঠলো ঝলমলে ডাল লেক। সে এক অপূর্ব লাল রঙে সেজেছিল সেদিন, সূর্যের রঙ, পাহাড়ের গায়ে আর পানিতে পরে পুরো ডাল লেকই যেন হয়ে উঠেছিল এক লালের আঁধার! যেন শ্রীনগরে বিয়ের সাঁজ পরেছে। এঁকে, এঁকে হাউজ বোটের সামনে এসে ভিড়তে লাগলো শালের বহর, ফলের পসরা, নানা রকম গয়না, উপহার সামগ্রীর অনেক অনেক আয়োজন ছাড়াও, কাশ্মীরি পোশাকের নানা রকম মহড়া। এর মধ্যে কাশ্মীরি সেই বিখ্যাত ড্রেস পরে ছবি তুলে দেয়ার নানা রকম পায়তারা তো চলছেই।

অনেকে অনেক কিছু কিনলেও দোকানিদের মন ভরাতে পারলোনা কেউ। সেই সাথে দুপুরের আহারের সময় হয়ে গেল। দুপুরের খাবার শেষ করে সবাই হাউজ বোট ছেড়ে চললাম পরী মহলের দিকে। সেই পরী মহলের গল্পটা অন্যদিন। আজ শুধু হাউজ বোটের গল্পটিই বলি। পরী মহল থেকে হাউজ বোটে ফিরে সবাই আবার বিশ্রামে চলে গেলাম। উঠলাম ইফতারির একটু আগে আগে। তখন আমাদের ঘড়িতে সাতটা বেজে গেছে কিন্তু এখানে সন্ধা নাকি হয় সেই আট টায়! আযান সাতটা পঁয়তাল্লিশ এ! কি আর করার হাউজ বোটের সামনের লনে চলে এলাম।

এসেই দেখি এক অন্য ডাল লেক। দুপুরে যেটা শুধু লালের ছোঁয়া ছিল, এখন সেটা শত রঙের খেলায় মেতেছে এক এক যায়গায় সূর্যের এক এক রকম রঙ লেগেছে সবুজ পাহাড়ে হয়েছে হলুদ রঙ, নীল পানিতে হয়েছে মেরুন, দূরের সাদা পাহাড়ে হয়েছে গোলাপি আর লাল! কাছে-পিঠের গাছে গাছে অবর্ণনীয় আলোর ঝলকানি! সে এক অদ্ভুত রঙের খেলায় মেতেছিল পুরো ডাল লেক, পাহাড়, বরফে মোড়া চূড়া, নাম না জানা শত গাছের পাতায়, লেকের পানিতে, আর হাজারো আলোর ঝলমলে বাতি জলে উঠেছিল শত শত হাউজ বোটের সামনের কাঠের বেলকোনিতে।

সে এক অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের অনিন্দ সুন্দর রূপ দেখেছিলাম সেদিন, পুরো ডাল লেকের। সকালে এক সোনা মাখা হলুদাভ রূপ, দুপুরে সবুজে, ছায়ায় আর পানিতে সূর্যের শত রঙের খেলা আর বিকেলে শেষের সন্ধা থেকে রাতে এক অবর্ণনীয় সাঁজে সেজেছিল ডাল লেক। কোন রঙের কমতি ছিলোনা কোথাও, আর উপরি পাওনা হিসেবে ছিল রমজান শেষের অন্ধকার আকাশের লক্ষ-কোটি তারা ভরা আকাশের অপার্থিব সম্মোহন।

পুরোপুরি পরিপূর্ণ এক ডাল লেকের দেখা পেয়েছিলাম সেদিন। ঠিক যেমনটা পেতে চেয়েছিলাম। হুবহু তেমন করে, উপভোগ করেছি মন আর প্রান ভরে সকালের, দুপুরের, বিকেলের, সন্ধ্যার আর স্নিগ্ধ রাতের অপরুপ ডাল লেক।

থাকা-খাওয়া আর যাওয়া-আসাঃ ডাল লেকে থাকা খাওয়ার খুব একটা খরচ নেই। হাউজ বোটের রুম ভাড়া পাবেন ১০০০ এর মধ্যেই। খাবার খরচ জন প্রতি ৩০০ টাকা প্রতি বেলা। তবে এক রুমে তিনজন থাকতে পারবেন অনায়াসে। আর যেতে পারেন প্লেনে বা ট্রেনে, যেভাবে সময় আর সাধ্যে মেলে। ঢাকা থেকে কলকাতা, দিল্লী হয়ে শ্রীনগর নেমে, অটো বা ট্যাক্সিতে ডাল লেকের পাড়ে।

ডাল লেক


Spread the love
  • 609
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    609
    Shares
Tags:
Sajol Zahid

দেখি-পড়ি-লিখি

    1

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *